অপ্রকাশিত অনুভূতি

By Fulkuri gmail 2 hours ago
34 views
সবাই ভাবে আমি খুব শক্ত মানুষ। সবকিছু সহজভাবে নিতে পারি, হাসতে পারি, কথা বলতে পারি, স্বাভাবিক থাকতে পারি। কিন্তু সত্যিটা হলো—আমার ভেতরেও একটা ভাঙা শহর আছে, যেখানে প্রতিদিন নীরবে ধসে পড়ে কিছু স্বপ্ন, কিছু আশা, কিছু না বলা কথা। বাইরে থেকে যে মানুষটাকে এত হাসিখুশি দেখায়, তার ভেতরে কতটা ঝড় বয়ে যায়, সেটা কেউ জানে না। আর জানার চেষ্টাও করে না। কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো শব্দে বোঝানো যায় না। বোঝাতে গেলেই গলা ধরে আসে, চোখ ভিজে ওঠে। তাই চুপ থাকাই সহজ মনে হয়। কারণ মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে, কিন্তু গভীর কষ্টের ভার নিতে চায় না। তারা সহানুভূতির দুটো কথা বলবে, তারপর নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যাবে। অথচ আমি তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি—একই শূন্যতা নিয়ে। রাতগুলো সবচেয়ে কঠিন। দিনের আলোতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায়, মানুষের ভিড়ে কষ্টগুলোকে লুকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু রাত নামলেই চারপাশের নীরবতা আমাকে ঘিরে ধরে। তখন মনে হয়, নিজের ভেতরের শব্দগুলোই সবচেয়ে জোরে চিৎকার করছে। পুরোনো স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে আসে। কিছু হাসির মুহূর্ত, কিছু প্রিয় কথা, কিছু স্বপ্ন—যেগুলো একসময় খুব আপন ছিল, আজ সেগুলোই সবচেয়ে বেশি ব্যথা দেয়। সবচেয়ে কষ্ট লাগে তখন, যখন বুঝতে পারি—যাকে নিজের সবকিছু ভেবেছিলাম, সে আসলে আমার ছিলই না। আমি শুধু বিশ্বাস করেছিলাম। আমি শুধু ভেবেছিলাম, “এই মানুষটা কখনো ছেড়ে যাবে না।” কিন্তু মানুষ বদলে যায়। সময় বদলে দেয়, পরিস্থিতি বদলে দেয়, কখনো কখনো সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও দূরত্ব তৈরি করে দেয়। আর সেই দূরত্ব ধীরে ধীরে এমন এক দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, যেটা আর কোনোদিন ভাঙা যায় না। আমি চেষ্টা করেছিলাম সব ঠিক রাখতে। নিজের ইগো, নিজের অভিমান, নিজের কষ্ট—সবকিছু পাশে রেখে সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একা একা কি আর সবকিছু টিকিয়ে রাখা যায়? একটা সম্পর্ক দুইজনের চেষ্টায় বাঁচে, একজনের ভালোবাসায় নয়। আমি যতই আঁকড়ে ধরেছি, সে ততই দূরে সরে গেছে। শেষে একসময় হাত ছেড়ে দিয়েছে। আর আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি মাঝপথে—না পুরোপুরি ভাঙা, না পুরোপুরি ঠিক। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে শেখানোর জন্য। তারা থাকে না, কিন্তু অনেক কিছু শিখিয়ে যায়। শিখিয়ে যায় কীভাবে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নেই। শিখিয়ে যায় নিজের মূল্য বুঝতে। শিখিয়ে যায়, সব ভালোবাসার শেষ একসাথে হওয়া নয়। কখনো কখনো ভালোবাসার মানে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু এই শেখাগুলো খুব সহজে আসে না। এর পেছনে থাকে অসংখ্য রাতের কান্না, অসংখ্য দিনের অভিনয় করা হাসি। আমার সবচেয়ে বড় কষ্টটা হলো—আমি কাউকে দোষ দিতে পারি না। কারণ হয়তো সে তার মতো ঠিকই ছিল। হয়তো তার জীবনে অন্য কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হয়তো আমি তার গল্পের মূল চরিত্র ছিলাম না, শুধু একটা অধ্যায় ছিলাম। কিন্তু আমার কাছে সে ছিল পুরো গল্প। এই অসমতা থেকেই জন্ম নেয় সবচেয়ে গভীর কষ্ট। অনেক সময় নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি যথেষ্ট ছিলাম না? আমার ভালোবাসায় কি কোনো ঘাটতি ছিল? আমি কি বেশি অনুভূতিপ্রবণ ছিলাম? নাকি খুব সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম? উত্তর পাই না। শুধু একটা শূন্যতা অনুভব করি। যেন বুকের ভেতর একটা জায়গা আছে, যেখানে কেউ একসময় বাস করত, এখন সে জায়গাটা খালি। আর সেই খালি জায়গাটা মাঝেমধ্যে খুব ব্যথা করে। বন্ধুদের সামনে হাসি, পরিবারের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। কারণ তারা চিন্তা করুক, সেটা চাই না। কিন্তু নিজের সঙ্গে যখন একা থাকি, তখন সব মুখোশ খুলে যায়। তখন বুঝতে পারি, আমি এখনো পুরোপুরি এগোতে পারিনি। এখনো কিছু কথা মনে পড়লে মন ভারী হয়ে যায়। এখনো কিছু গান শুনলে চোখ ভিজে ওঠে। এখনো কিছু জায়গা এড়িয়ে চলি, কারণ সেখানে গেলে স্মৃতিগুলো খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবুও জীবন থেমে থাকে না। সময় তার নিজের গতিতে চলতে থাকে। আমাকেও চলতে হয়। প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করি। নিজেকে বোঝাই—সব শেষ হয়ে যায়নি। একটা মানুষ চলে গেছে মানেই পুরো পৃথিবী ফাঁকা হয়ে যায় না। কিন্তু মনের একটা অংশ মানতে চায় না। সে বারবার পুরোনো দরজায় কড়া নাড়ে। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ভুলে যাওয়া নয়, মেনে নেওয়া। ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কিছু মানুষ, কিছু স্মৃতি কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। কিন্তু মেনে নেওয়া যায়—যে সবকিছু আমাদের মতো করে হয় না। কিছু স্বপ্ন ভেঙে যায়, কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়। আর সেই অপূর্ণতাগুলো নিয়েই আমাদের বাঁচতে শিখতে হয়। আজকাল আমি আর কাউকে সহজে আমার ভেতরের গল্পটা বলি না। কারণ বুঝে গেছি, সবাই শুনলেও অনুভব করে না। তাই নিজের কষ্টগুলো নিজের কাছেই রাখি। ডায়েরির পাতায় লিখে ফেলি, অথবা চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আকাশটা অন্তত বিচার করে না। সে শুধু চুপচাপ সব শুনে যায়। আমি জানি, একদিন হয়তো এই কষ্টও কমে যাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির রঙ ফিকে হয়ে যাবে। হয়তো একদিন তার নাম শুনেও আর বুক ধকধক করবে না। কিন্তু আজ যে ব্যথাটা অনুভব করছি, সেটা সত্যি। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই কষ্টই প্রমাণ করে, আমি সত্যি ভালোবেসেছিলাম। আমি মনের সবটুকু দিয়ে কাউকে নিজের ভেবেছিলাম। হয়তো ভবিষ্যতে আবার কাউকে বিশ্বাস করব। আবার নতুন করে শুরু করব। কিন্তু এই ভাঙা অধ্যায়টা আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে। এটা আমাকে দুর্বল করেনি, বরং একটু বেশি বাস্তববাদী করেছে। শিখিয়েছে—নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে হয়। কারণ দিন শেষে সবাই পাশে না থাকলেও, নিজেকে নিয়েই বাঁচতে হয়। আজ আমি কাঁদি, কিন্তু জানি এই কান্নাও একদিন থেমে যাবে। আজ আমি একা অনুভব করি, কিন্তু জানি একাকীত্বও চিরস্থায়ী নয়। জীবন কখনো পুরো অন্ধকারে ঢেকে থাকে না। কোথাও না কোথাও একটু আলো থাকে। হয়তো এখনো আমি সেই আলোটা খুঁজে পাইনি, কিন্তু খুঁজে যাব। কারণ ভাঙা মন নিয়েও বেঁচে থাকা যায়। কষ্ট নিয়েও হাসা যায়। হারিয়েও আবার শুরু করা যায়। আর এই নীরব কষ্টই একদিন আমার শক্তি হয়ে দাঁড়াবে। হয়তো তখন আমি ফিরে তাকিয়ে বলব— “হ্যাঁ, আমি ভেঙেছিলাম। কিন্তু শেষ হয়ে যাইনি।”
Latest Videos Febspot Explore Monetization Terms of Service About Us Copyright Cookie Privacy Contact